২য় বিয়ে করার নিয়ম
২য় বিয়ে করার নিয়ম

২য় বিয়ে করার নিয়ম: প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে কি হয়?

শফিক সাহেব একটি মাল্টিন্যাশননাল কোম্পানির CEO। তিনি ২য় বিয়ে করতে চান। কিন্তু তিনি ২য় বিয়ের নিয়ম জানেন না। তিনি চান তার ১ম স্ত্রী কে না না জানিয়ে ২য় বিয়ে করতে। এখন তিনি গিয়েছেন একজন আইনজীবীর আছে। শফিক সাহেব আইনজীবীর কাছে জানতে চান কোন রকম আইনি ঝামেলায় না পরে ১ম স্ত্রীকে না জানিয়ে ২য় বিয়ে করা যায় কিনা।

চলুন আজকে আমরা জানি বাংলাদেশে ২য় বিয়ে করার নিয়ম কি এবং প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে কি হয় বা কি সাজা হতে পারে সে সম্পর্কে জেনে নেই।

প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় একজন ব্যাক্তি চাইলেই সরাসরি ২য় বিয়ে করতে পারেন না। বাংলাদেশের আইনে এটি একোটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে ২য় বিয়ে যে করা যাবে না বিষয়টা তেমন না। বাংলাদেশের আইন এবং ইসলাম ধর্ম একজন পুরুষকে একাধিক বিয়ে করার অধিকার দিয়েছে। আল কুরয়ানে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন “তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দু’টি, তিনটি অথবা চারটি” (সুরা নিসা, আঃ ৩)। এটা ধর্ম যে পুরুষকে শুধু একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছে তাই নয় পাশাপাশি একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে কোঠোর বিধি বিধান দিয়েছে।

পুরুষেরা একাধিক বিয়ের বিধান মানতে খুব খুশি হলেও একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে যে বিধি বিধান মেনে চলতে হয় তা মানতে এবং জানতে নারাজ। সূরা নিসার একই আয়াতের শেষাংশে বলে হয়েছে “আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি”। অর্থাৎ সকল স্ত্রীর সাথে একই ধরেনের আচরন বা ইনসাফ যদি করতে না পারে তবে একটি বিয়ের কথা কুরয়ানে স্পষ্ট করে বলা আছে। ইসলামের চার মাঝহাবের চার জন ইমাম ই মোটামোটি একটি বিয়েকেই উত্তম বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।    

ধর্ম যেমন পুরুষ কে একাধিক বিয়ের সুযোগ দিলেও কঠোর বিধিবিধান বেধে দিয়েছে, তেমনি ভাবে বাংলাদেশ সরকার ও ২য় বিয়ে বা একাধিক বিয়ে করার কিছু নিয়ম নির্ধারন করেছে। যদি কেউ এই নিয়ম না মেনে ২য় বিয়ে করে তবে তাকে গুনতে হবে জরিমানা, যেতে হবে জেলে। মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ (১৯৬১) অনুযায়ী, সালিশি পরিষদ (Arbitration Council) এর পূর্বানুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্বামীকে ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড বিধান রয়েছে। এছাড়া, বর্তমান স্ত্রীকের সাথে সাথে বাকি দেনমোহর বুঝিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন।

তাহলে ২য় বিয়ের আইনগত নিয়ম কি?

কোন পুরুষ ২য় বিয়ে করতে চাইলে প্রথমেই তাকে সালিসি পরিষদের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে। অনেকে মনে করে স্ত্রী কাছে মৌখিক অনুমতি নিয়ে নিলেই হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে হবে না। কারন স্ত্রী যদি প্রথমে অনুমতি দেয় ও পরবর্তিতে যদি এটা অস্বীকার করেন তাহলে আপনি মামলাতে পরে যাবেন এবং আপনার জেল জরিমানা হতে পারে। তাই আপনাকে সালিসি পরিষদের কাছে আবেদন করতে হবে। আপনার এলাকার ইউনিয়ন/পৌরসভার চেয়াম্যান বা কমিশনার/মেম্বার এবং স্বামী স্ত্রীর উভয় পক্ষের ১ জন প্রতিনিধি নিয়ে কোন পারিবারিক বিষয় সমাধানের সালিসি পরিষদ গঠন করা হয়।

কোথায় ২য় বিয়ের জন্য আবেদন করতে হয়?

আপনার বর্তমান (প্রথম) স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার চেয়ারম্যান/মেয়র/কাউন্সিলরের কাছে নির্ধারিত ফি দিয়ে লিখিত আবেদন করতে হবে। আবেদনে অবশ্যই দুইটা বিষয় উল্লেখ থাকতে হবে

১। কেন ২য় বিয়ে করতে চাচ্ছেন এবং

২। এতে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি আছে কিনা।

এই দুইটা বিষয়ের কোন একটা উল্লেখ না থাকলে আবেদন বাতিল বলে গন্য হবে।

সালিসি পরিষদ গঠন

আপনার আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান/মেয়র সাহেব সালিসি পরিষদ গঠন করেবন। এই পরিষদে চেয়ারম্যান নিজে থাকবেন অথবা কমিশনার থাকবেন এবং প্রথম স্ত্রী ও স্বামী উভয় পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলা হবে। আপনি আবেদন করলে স্ত্রীর নিকট নোটিশ পাঠানো হবে বা লোক পাঠিয়ে সংবাদ দিয়ে সালিসি পরিষদের বৈঠকের ডেট জানিয়ে দেয়া হবে।

সালিশি পরিষদ দুই পক্ষের যুক্তি শুনবেন এবং দ্বিতীয় বিয়ের কারণ যেমন, প্রথম স্ত্রীর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, বন্ধ্যাত্ব বা দাম্পত্য জীবন বজায় রাখতে শারীরিক অক্ষমতা ইত্যাদি আছে কিনা এবং তা লজিক্যাল কি না, তা যাচাই করবেন।

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে পরিষদ যদি মনে করে ২য় বিয়ের অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন এবং ন্যায়সঙ্গত, কেবল তখনই তিনি দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিবেন এবং তা অবশ্যই লিখিত অনুমতি হতে হবে।

দেনমোহর পরিষদ

আইন অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন করার সাথে সাথেই প্রথম স্ত্রীর বাকি দেনমোহর সাথে সাথে পরিশোধ করে দিতে হবে। যদি দেনমোহর পরিশোধ না করা হয় সালিশি পরিষদ দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিবে না।

সালিসি পরিষদের অনুমতি ব্যাতিত ২য় বিয়ে করলে কি সাজা হয়?

সালিসি পরিষদের অনুমতি ব্যাতিত ২য় বিয়ে করলে দুই রকম সাজা হতে পারে। শুধু মুসলিমদের জন্য মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী কেউ যদি সালিসি পরিষদের অনুমতি ব্যাতিত ২য় বিয়ে করে তাহলে তার ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

এছাড়া মুসলিম সহ অন্যান্য যেকোন ধর্মের কেউ যদি পূর্বের স্ত্রী থাকা অবস্থায় বিয়ে করে তাহলে দন্ডবিধির ৯৯৪ ধারার তার নামে মামলা করা যেতে পারে। সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এর সাথে আসামিকে অর্থদণ্ড দেয়া হতে পারে।

দন্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় কাউকে শাস্তি দিতে হলে আদালতে ৩টি বিষয় প্রমাণ করতে হবে:

১। অভিযুক্ত ব্যক্তির আগে একটি বৈধ বিয়ে হয়েছিল।

২। প্রথম স্বামী বা স্ত্রী এখনো জীবিত আছেন।

৩। প্রথম বিয়েটি আইনগতভাবে চলমান থাকা অবস্থাতেই ওই ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়েটি করেছেন (অর্থাৎ ডিভোর্স বা তালাক না দিয়েই ২য় বিয়ে করেছেন)।

দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারাটি সকল ধর্মের সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও, মুসলিম পুরুষদের ক্ষেত্রে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারা অনুযায়ী সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে ১ বছরের জেল বা ১০,০০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। তবে প্রথম স্ত্রীকে গোপ্ন করে, জালিয়াতি বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা (৭ বছরের সাজা) এবং ৪৯৫ ধারার (১০ বছরের সাজা) তেও অভিযুক্ত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। প্রমান করতে পারলে সাজা হয়ে যাবে।

তাই শফিক সাহেব যদি ২য় বিয়ে করতেই চান আইন মেনে সালিসি পরিষদের অনুমতি সাপেক্ষে যদি বিয়ে করেন তাহলে তিনি কোন আইনগত ঝামেলায় পরবেন না। তবে যদি আইন না মেনে বিয়ে গোপন করে বিয়ে করেন তাহলে তার জন্য রয়েছে জেল এবং জরিমানার ব্যাবস্থা।