মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা ২০২৫-এর সংশোধনীতে এল বড় পরিবর্তন। কাবিননামা থেকে বাদ পড়ল ‘কুমারী’ শব্দ, চালু হলো অনলাইন ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন। জানুন নতুন নিয়ম, ফি পরিশোধ ও বয়স প্রমাণের বিস্তারিত।

বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন এবং নারীবান্ধব করার লক্ষ্যে সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ২৪ মার্চ ২০২৫ তারিখে এক প্রজ্ঞাপনের (এস, আর, ও নং-৯২-আইন/২০২৫) মাধ্যমে ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯’-এর অধিকতর সংশোধন করেছে।
এই সংশোধনীর ফলে কাবিননামার শব্দচয়ন থেকে শুরু করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া—সবকিছুতেই এসেছে ডিজিটাল ছোঁয়া। আজকের ব্লগে আমরা জানবো এই নতুন গেজেট অনুযায়ী কী কী পরিবর্তন এসেছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য এর সুফল কী।
১. কাবিননামায় ‘কুমারী’ শব্দের ঐতিহাসিক বিদায়
দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকারকর্মী এবং নারীবাদী সংগঠনগুলো কাবিননামার ৫ নম্বর কলামে ব্যবহুত ‘কুমারী’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। নতুন সংশোধনীতে এই শব্দটি বাতিল করে সেখানে “অবিবাহিতা” শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
* কেন এই পরিবর্তন? ‘কুমারী’ শব্দটি নারীর গোপনীয়তা ও সম্মানের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করা হতো। ‘অবিবাহিতা’ শব্দটি ব্যবহার করে রাষ্ট্র নারীর মর্যাদাকে আরও সুসংহত করলো।
২. চালু হলো অনলাইন ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় যুক্ত হলো বিবাহ নিবন্ধন। নতুন বিধি ২১ক অনুযায়ী, এখন থেকে নিকাহ্ ও তালাক নিবন্ধন ম্যানুয়ালি (হাতে লিখে) অথবা অনলাইন পদ্ধতিতে সম্পাদন করা যাবে।
অনলাইন নিবন্ধনের সুবিধাসমূহ:
* ডিজিটাল ভলিউম: অনলাইনে নিবন্ধন করলে ফরম ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ ও ‘ঘ’ এর রেজিস্টার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে যাবে। কাজি সাহেবকে কষ্ট করে আর ভলিউম লিখতে হবে না।
* ফি পরিশোধ: রেজিস্ট্রেশন ফি এখন আর নগদে দেওয়ার ঝামেলা নেই। ডিজিটাল মাধ্যম (বিকাশ/নগদ/ব্যাংক কার্ড) বা সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে ফি জমা দেওয়া যাবে।
* স্বাক্ষর ও টিপসহি: অনলাইনের ফরম ‘ঘ’-তে বর-কনে ও সাক্ষীরা ডিজিটাল প্যাডে স্বাক্ষর করতে পারবেন। নিরক্ষর ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল টিপসহি গ্রহণ করা হবে।
৩. বিয়ের বয়স প্রমাণে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বাধ্যতামূলক
বাল্যবিবাহ রোধে এবং ভুয়া তথ্য দেওয়া বন্ধ করতে বয়স প্রমাণের দলিলে কঠোরতা আনা হয়েছে। কাবিননামার ৩ ও ৬ নম্বর কলামে বরের ও কনের বয়স প্রমাণের জন্য নিচের ডকুমেন্টগুলো পর্যায়ক্রমে অগ্রাধিকার পাবে:
* জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) (প্রথমে এটি চাওয়া হবে)।
* NID না থাকলে জন্ম নিবন্ধন সনদ।
* তা না থাকলে জেএসসি (JSC) / এসএসসি (SSC) বা সমমানের পরীক্ষার সনদ।
* উপরের কোনোটিই না থাকলে—বাবা, মা বা অভিভাবক প্রদত্ত হলফনামা (Affidavit)।
৪. পাসপোর্ট সাইজের ছবি বাধ্যতামূলক
আগে কাবিননামায় ছবির ব্যবহার ঐচ্ছিক বা শিথিলযোগ্য থাকলেও, নতুন বিধিমালার ক্রমিক নং ৬ক অনুযায়ী বর ও কনের পাসপোর্ট সাইজের ছবি সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি ভুয়া বিয়ে বা পরিচয় জালিয়াতি রোধে অত্যন্ত কার্যকর হবে।
৫. তালাক সনদেও পরিবর্তন
শুধুমাত্র বিবাহ নয়, তালাক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অনলাইন সুবিধা এবং নির্ধারিত ফরম (ফরম ‘ছ১’) ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: অনলাইন ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না, গেজেট অনুযায়ী নিবন্ধন প্রক্রিয়া ম্যানুয়ালি বা অনলাইন—উভয় পদ্ধতিতেই করা যাবে। তবে অনলাইন পদ্ধতিটি বেশি নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত।
প্রশ্ন: কাবিননামায় এখন কী লেখা থাকবে?
উত্তর: কনের স্ট্যাটাস বা অবস্থা বোঝাতে এখন ‘কুমারী’র পরিবর্তে ‘অবিবাহিতা’ লেখা থাকবে।
প্রশ্ন: অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন ফি কীভাবে দেব?
উত্তর: সরকার নির্ধারিত ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করা যাবে।
উপসংহার
সরকারের এই নতুন সংশোধনী (এস, আর, ও নং-৯২-আইন/২০২৫) বিবাহ নিবন্ধন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসবে। বিশেষ করে অনলাইনে তথ্য সংরক্ষিত থাকায় কাবিননামা হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার ভয় থাকবে না। আপনি যদি শীঘ্রই বিবাহের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে নতুন এই নিয়মগুলো জেনে রাখা আপনার জন্য জরুরি।
আইন বিষয়ক আরও তথ্য, পরামর্শ এবং ড্রাফটিং এর জন্য আমাদের ওয়েবসাইট www.bdlawhub.com ভিজিট করুন বা আমাদের ফেইসবুক পেজে যুক্ত থাকুন।


