জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ পাঁচজন কমিশনার সম্প্রতি একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। সোমবার (১৩ এপ্রিল) প্রকাশিত এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন মো. নূর খান লিটন, ইলিরা দেওয়ান, অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস। সংসদীয় বিতর্কে মানবাধিকার অধ্যাদেশগুলো নিয়ে যে সব ভুল তথ্য উঠে এসেছে, তার জবাব দিতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
চিঠির মূল বিষয়বস্তুকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে: সংসদে দেওয়া তথ্যের অসারতা প্রমাণ, সরকারের আপত্তির আসল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে আইনের মান কেমন হওয়া উচিত তার প্রস্তাবনা।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যের বিভ্রান্তি ও প্রকৃত সত্য
অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পক্ষে সংসদে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সাথে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে কমিশনাররা মনে করেন। বিশেষ করে ‘গুম প্রতিরোধ’ এবং ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা’ সংক্রান্ত আইনগুলো যেহেতু মূল মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই এগুলো বাতিলের ফলে আইনি শূন্যতা তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। চিঠিতে উঠে আসা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো:
১. সাজার মেয়াদ নিয়ে বিভ্রান্তি: সংসদে বলা হয়েছে গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর। অথচ বাস্তব সত্য হলো, অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারায় অপরাধের গুরুত্ব বুঝে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান স্পষ্ট রাখা হয়েছিল।
২. তদন্ত ও জরিমানার বিধান: অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, তদন্তের কোনো সময়সীমা বা জরিমানা আদায়ের উপায় নেই। অথচ ২০০৯ সালের পুরোনো আইনের তুলনায় এই অধ্যাদেশেই প্রথম তদন্তের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল এবং জরিমানা আদায়ের বিস্তারিত পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছিল। সময়মতো প্রতিবেদন না দিলে শাস্তির বিধানও সেখানে ছিল।
৩. আইসিটি বনাম গুম অধ্যাদেশ: সরকার বলছে আইসিটি আইনই যথেষ্ট। কিন্তু আইসিটি আইন মূলত ‘গণহারে’ হওয়া অপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে। ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন গুমের ঘটনার বিচার সাধারণ ফৌজদারি আইনে হওয়া প্রয়োজন, যা এই অধ্যাদেশে ছিল। এখন এটি বাতিল হওয়ায় নতুন কোনো গুমের ঘটনা ঘটলে তার বিচার কোন আইনে হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
৪. জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা: বলা হচ্ছে যোদ্ধারা সুরক্ষিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নতুন নিয়মে জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর তদন্ত করবে সেই সব বাহিনী, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল। পক্ষান্তরে, অধ্যাদেশটি বহাল থাকলে মানবাধিকার কমিশন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারত। এখন জুলাই যোদ্ধাদের ভাগ্য কার্যত তাদের প্রতিপক্ষ বাহিনীর হাতেই চলে গেল।
৫. পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ: কমিশন নিজেই বাদী হয়ে মামলা করলে তা পক্ষপাতমূলক হবে বলে দাবি করা হয়েছে। এটি একটি ভুল ধারণা। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তাও নিয়মিত বাদী হয়ে মামলা করেন, যা আইনি প্রক্রিয়ারই অংশ। কমিশন বিচারকের ভূমিকা পালন না করলে এখানে স্বার্থের সংঘাত হওয়ার সুযোগ নেই।
সরকারের আপত্তির আসল কারণ কী?
কমিশনারদের মতে, সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে সরকারের যে আপত্তিগুলো দেখা গেছে, তার মূল লক্ষ্য হলো কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব করা। সরকার চায় কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখতে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গেলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে—এমন শর্ত আরোপ করতে। বিগত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, গুম বা নির্যাতনের অভিযোগগুলো মূলত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধেই থাকে। ফলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার অনুমতি নিয়ে তদন্ত করা কতটা কার্যকর হবে, তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া বাছাই কমিটিতে সরকারি লোক বাড়িয়ে কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার একটি প্রচ্ছন্ন চেষ্টা কাজ করছে।
ভবিষ্যৎ পথচলা ও আমাদের করণীয়
সরকার বলছে যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী আইন করা হবে। কিন্তু কমিশনাররা আশঙ্কা করছেন, সরকারের বর্তমান আপত্তিগুলো বহাল রেখে আইন করলে তা ২০০৯ সালের আইনের মতোই নখদন্তহীন হবে। আইনি শূন্যতা তৈরি না করেও পরামর্শের ভিত্তিতে সংশোধনের পথ খোলা ছিল।
আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এখন রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। তাই ভবিষ্যতে যে আইনই আসুক না কেন, সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো লক্ষ্য রাখবে—আইনটি কি সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় তৈরি হচ্ছে, নাকি সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে?
দিনের শেষে যে পরিবারগুলো এখনো তাদের নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছে, তাদের জন্য কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আইনি কাঠামো।



