বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আইন বিষয়ক সাইটে আপনাকে স্বাগতম
অর্থ ঋণ আইন

অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩

অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩

(২০০৩ সনের ৮নং আইন)

[তাং- ১০ই মার্চ, ২০০৩ ইং]

আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঋণ আদায়ের জন্য প্রচলিত আইনের অধিকতর সংশোধন ও সংহতকরণকল্পে প্রণীত আইন।

যেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ আদায়ের জন্য প্রচলিত আইনের অধিকতর সংশোধন ও সংহতকরণ প্রয়োজনীয়;

সেহেতু এতদদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল:-

প্রস্তাবনা

১। আইনটির উদ্দেশ্য;

২। ইতিহাস;

৩। আইনটির বৈশিষ্টাবলী;

৪। অর্থঋণ আদালত, ১৯৯০ ও অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর তুলনামূলক আলোচনা।

১। অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর উদ্দেশ্য:

বাস্তবতাঃ বাংলাদেশে বর্তমান ঋণ প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিরাজমান অবস্থা থেকে উত্তরনের কার্যকর উপায় উদ্ভাবন ও অনুশীলনের উদ্দেশ্যেই অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ প্রণয়ন ও প্রয়োগের উদ্যোগ। এটি একটি যুগান্তকারী আইন।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা ঋণ অনাদায়ী রয়েছে। তন্মধ্যে ২৪ হাজার কোটি টাকা কু-ঋণে পরিণত হয়েছে, বা আদায় হবার সম্ভাবনা নেই বললে কোন অত্যুক্তি হবে না।

এ অনাদায়ী ঋণের টাকা আদায়ের একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর উপায় স্বরূপ এ আইনের অবতারণা। আইনের প্রকৃতি সে আইনের বাস্তবায়ন তথা অনুশীলনকে করে বেগবান তথা ফলপ্রসূ। অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ উহার একটি বাস্তবরূপ হিসেবে স্বকীয় মহিমায় অবতীর্ণ হবে বলে সর্বমহলের বিশ্বাস।

অর্থঋন আদালত আইন, ২০০৩ এর উদ্দেশ্য মূলত দু’টি-

প্রথমত: এ পর্যন্ত যেসব ঋণের টাকা অনাদায়ী রয়েছে তা আদায়ের কার্যকর চা পদক্ষেপ গ্রহণ; এবং 

দ্বিতীয়ত: আগামীতে যে ঋণ বিতরণ করা হবে তা যাতে সুষ্ঠু ও বাস্তব ভিত্তিক হয়, এবং সে ঋণ আদায়ে আইনগত এবং দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে কোন শিথিলতা না থাকে তা নিশ্চিত করা। কেননা যে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান তথা ব্যাংক একটি সেবামূলক দায়িত্বশীল ম্যাকানিজম। তাই সেখানে যেমন থাকতে পারে সেবা বিমুখতা, তেমনি দায়িত্বহীনতা।

এ আইনটির মাধ্যমে দায়িত্বশীল সেবাদান ব্যবস্থাকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

২। আইনটির ইতিহাস:

শুনতে কটু লাগলেও বলতে হয় যে, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ইতিহাস বড় করুণ। কেননা এটি অর্থঋণ আদালত আইন, ১৯৯০ (১৯৯০ সালের ৪নং আইন) এর ব্যর্থতার ফলশ্রুতি। ১৯৯০ সালের আইনটি ছিল অস্বয়ং সম্পূর্ণ, ফলে উক্ত আইনের বিধান অনুবর্তনের মাধ্যমে আইনটির উদ্দেশ্য অর্জন প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে। নানা ক্ষেত্রে দেখা দেয় সীমাবদ্ধতা ও অসংগতি তথা অসামঞ্জস্যশীলতা। যেখানে ঋণ আদায়ের জন্য পূর্বোক্ত আইনটি প্রণীত ও প্রবর্তিত হয়, সেখানে বরং ঋণ আদায়ের পরিবর্তে অনাদায়ী হতে থাকে অবিশ্বাস্য ঋণ অনদায়ীই গতিতে। বস্তুত এ কারণেই বর্তমান আইনটির অবতারনা।

বকেয়া ঋণ আদায়ে পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে এরূপ অর্থঋণ আদালত বা অন্য যে কোন নামের আইন ও ম্যাকানিজম। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানে এরূপ অর্থঋণ আদালত আইন রয়েছে।

৩। আইনটির বৈশিষ্ট্য:

অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ একটি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য মন্ডিত আইন। আইনটির সব থেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিরাজমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বাস্তব ব্যবস্থা তথা দিক নির্দেশনা সম্বলিত স্বয়ং সম্পূর্ণ (exhaustive) আইন।

আইনটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যাবলী নিম্নে বর্ণিত হলো:

১. অন্যান্য আইনের মতো সুষ্ঠু কাঠামোগত বিন্যাস প্রকৃতি সম্পন্ন।

২. ঋণ কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করণ। পূর্বেকার আইনে এটি ছিলনা।

৩. আইনটির কার্যকারীতার ক্ষেত্রে প্রাধান্যদান।

৪. আদালত গঠন, এখতিয়ার এবং কার্যপ্রণালীর ক্ষেত্রে নমনীয়তাপূর্ণ বিশিষ্টতা দান।

৫. সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির বাস্তব নির্দেশনা।

৬. প্রচলিত সনাতন পদ্ধতিতে মামলার যে কোন পর্বে বিরোধ নিষ্পত্তি বিধান প্রবর্তন।

৭. তামাদির গণনার ক্ষেত্রে বিরোধ ও প্রতিরোধমূলক বিশেষ বিধান প্রবর্তন।

৮. আদালতের সিদ্ধান্ত তথা রায় জারীর ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী অবস্থাও ব্যবস্থা প্রবর্তন।

৯. মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কোর্ট ফি ফেরৎ দান।

১০. সুষ্ট ও যথাযথ আপীল ও রিভিশন ব্যবস্থার বিধান।

১১. আদালত অবমাননা ও আদালতের সহজাত ক্ষমতার বিধান প্রবর্তন।

১২. আইনটির বাংলা ও ইংরেজী পাঠের ব্যবস্থা ইত্যাদি।

৪। অর্থঋণ আদালত আইন, ১৯৯০ এবং অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর মধ্যকার পার্থক্য:

দু’টি অর্থঋণ আদালতের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য যে পার্থক্য বিদ্যমান অ সংক্ষেপে নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

প্রথমতঃ অর্থঋণ আদালত আইন, ১৯৯০-এ ছিল ১১টি ধারা সম্বলিত একটি অস্বয়ংসম্পূর্ণ আইন।

অন্যদিকে, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩, ৬০টি ধারা সম্বলিত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন।

দ্বিতীয়তঃ পূর্বোক্ত আইনটিতে সকল ঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। কিন্তু বর্তমান আইনটিতে তা করা হয়েছে। যেমন বিসিকের কথা বলা যায়। গত আইনে এ প্রতিষ্ঠানটি সম্পৃক্ত ছিলনা। অথচ এটি প্রত্যক্ষভাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ঋণদান কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত। অনুরূপ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

তৃতীয়তঃ পূর্বোক্ত আইনে এ আদালতের জন্য জজ নিয়োগ করা হতো সাব-জজ পদ মর্যাদা সম্পূর্ণ বিচার বিভাগের কর্মকর্তাকে। কিন্তু এ আইনে যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদা সম্পন্ন বিচার বিভাগের কর্মকর্তাকে এ আদালতের জজ নিয়োগের বিধান করা হয়েছে।

চতুর্থতঃ ‘৯০-এর আইনে মামলা দায়েরে সুনির্দিষ্ট কোন বিধান ছিল না কিন্তু ২০০৩ এর আইনে এর বিধান করা হয়েছে।

পঞ্চমতঃ মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে মোকদ্দমা নিষ্পত্তির বিধান বর্তমান আইনে রাখা হয়েছে, যা কিনা পূর্বেরটিতে ছিল না।

ষষ্টতঃ তামাদি গণনার বিষয়টি বর্তমান আইনে অতিব বাস্তব সম্মত কিন্তু পূর্বেটার এরূপ কোন বিধান ছিলনা।

সপ্তমতঃ বর্তমান আইনে আপীল ও রিভিশনের বিধান সুনির্দিষ্ট ও সুবিস্তৃত যা পূর্বেরটাতে এমনভাবে ছিল না।

অষ্টমতঃ মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে মিমাংসিত মোকদ্দমাতে কোর্ট ফি ফেরতের বিধান রাখা হয়েছে, যা পূর্বেরটিতে ছিল্ অকল্পনীয়। [ধারা ২১ (৯)]।

নবমতঃ আদালত অবমাননা, আইনের ইংরেজী পাঠ ইত্যাদি পূর্বের আইনটিতে ছিল না, এটিতে তা আছে।

দশমতঃ বর্তমান আইনে দায়বদ্ধতার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, যা পূর্বেরটিতে ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।