নাটোর জেলার একটি ছোট্ট গ্রামের বাসিন্দা তাজওয়ার। শিক্ষিত, সচেতন, এবং উচ্চাভিলাষী এই যুবক পরিবারের আশা-ভরসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু। তাজওয়ারের শিক্ষাজীবন ছিলো সফলতায় পরিপূর্ণ। তিনি গ্রামের প্রথম ব্যক্তি যিনি অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার মেধা এবং অধ্যবসায়ের ফলে শিক্ষাজীবনে তিনি সবসময়ই প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তবে, তাজওয়ারের ভাগ্যে উচ্চ শিক্ষার আলো থাকলেও জীবিকার ক্ষেত্রে তিনি অতটাও ভাগ্যবান হননি। শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার পরেও দেশে একটি ভালো চাকরির অভাব তাজওয়ারকে হতাশায় নিমজ্জিত করে ফেলে। বেশ কয়েকবারের চাকরির আবেদন ও ইন্টারভিউয়ের পরও যখন আশানুরূপ চাকুরী হয় নাই, তখন তার সামনে একমাত্র বিকল্প হিসেবে সামনে আসে অন্য আট দশ জন অশিক্ষিত বেকারের ন্যায় বিদেশে যাওয়া।
সৌদি আরব যাওয়ার চিন্তা তার মনে আসে গ্রামের আরো কিছু মানুষের কথা শুনে, যারা বিদেশে গিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে পরিবারের জীবনে পরিবর্তন এনেছেন। তাজওয়ার নিজের ও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য সিদ্ধান্ত নেন সৌদি আরবে গিয়ে চাকুরী করে ভাগ্য বদলাবেন।
তবে, বিদেশ গমনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও খরচের কথা ভেবে তাজওয়ার দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। বিদেশ যাওয়ার জন্য ভিসা প্রসেসিং, টিকিট এবং অন্যান্য খরচের জন্য বিশাল অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। ইতিমধ্যে, তার সঙ্গে পরিচয় হয় রুবাইয়াত নামে একজনের, যিনি দেশের বাইরে লোক পাঠানোর কাজে সহায়তা করেন। রুবাইয়াতের প্রস্তাবে বিশ্বাস করে তাজওয়ার তার কাছে ৪ লক্ষ টাকা দেন, যা তার পরিবারের জমি বিক্রি করা অর্থ এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ধার করা টাকা।
রুবাইয়াত প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিন মাসের মধ্যে ভিসার ব্যবস্থা করে তাজওয়ারকে সৌদি আরবে পাঠাবে। কথা অনুযায়ী, সিকিউরিটি মানি বাবদ রুবাইয়াত তাজওয়ারকে ৪ লক্ষ টাকার একটি চেক দেন। শর্ত ছিল, যদি তিন মাসের মধ্যে রুবাইয়াত ভিসার ব্যবস্থা করতে না পারেন, তবে তাজওয়ার সেই চেকটি ভাঙিয়ে টাকা তুলে নিতে পারবেন। কিন্তু, এক বছর পার হওয়ার পরও রুবাইয়াত ভিসার কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি। তাজওয়ার হতাশ হয়ে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখন তাজওয়ার কীভাবে চেকের মামলা করবেন, তা ১৮৮১ সনের হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন অনুযায়ী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১৮৮১ সনের হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, চেক Dishonour হওয়ার পর ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে আসামীকে লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করতে হবে। এরপর, আসামী যেদিন নোটিশ গ্রহন করবে অথবা যে দিন গ্রহন না করায় নোটিশ ফেরত আসবে সে দিন থেক ৩০ দিন পর থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে চেকের মামলা দায়ের করতে হবে। উল্লেখ থাকে যে লিগ্যাল নোটিশ টি অবশ্যই রেজিস্ট্রি ডাক যোগে পাঠাতে হবে। এডি যোগে একটি নোটিশ পাঠাতে চিঠির সাথে ১৫ টাকার স্ট্যাম সংযুক্ত করতে হয়।
নালিশী মামলার মূল বিষয়সমূহ
চেক ডিসঅনারের মামলা করতে গেলে তাজওয়ারের পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবীকে নিচের বিষয়গুলো নালিশী মামলায় উল্লেখ করতে হবেঃ
১। আদালতের নামঃ প্রথমে সেই আদালতের নাম উল্লেখ করতে হবে যেখানে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, “নাটোর সদর আমলী আদালত, নাটোর”।
২। বাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়ঃ তাজওয়ারের সম্পূর্ণ নাম, ঠিকানা ও পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, যাতে করে বাদীর পরিচয় নিয়ে কোনো লুকোচুরি না থাকে।
৩। আসামীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়ঃ রুবাইয়াতের নাম, ঠিকানা ও পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে। যদি রুবাইয়াতের ঠিকানা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকে, তবে সম্ভাব্য সঠিক ঠিকানা ব্যবহার করলেও হবে।
৪। চেক লেনদেনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ তাজওয়ার ও রুবাইয়াতের মধ্যে চুক্তির ধরন এবং চেক কেন প্রদান করা হয়েছিল বিষয়টি সংক্ষেপে উল্লেখ করতে হবে।
৫। চেক প্রদানের তারিখ, হিসাব নম্বর, ব্যাংকের নাম, শাখার নাম, চেক নম্বর ও টাকার পরিমাণঃ যে চেকটি প্রদান করা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য যেমন: তারিখ, ব্যাংকের নাম, শাখার নাম, চেক নম্বর, এবং চেকে উল্লেখিত টাকার পরিমাণ সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।
৬। চেকটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার তারিখ ও Dishonour হওয়ার কারণঃ চেকটি কবে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছিল, এবং কখন ও কেন তা Dishonour হয়েছে, তা উল্লেখ করতে হবে।
৭। ডিজঅনারড হওয়ার তারিখঃ চেকটি Dishonour হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখটি সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে, যা আদালতে প্রমাণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
৮। নালিশের কারণঃ কেন তাজওয়ার মামলা দায়ের করছেন, এবং চেক Dishonour হওয়ার পর তিনি কি ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তা বর্ণনা করতে হবে।
৯। লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণের তারিখঃ তাজওয়ার কখন রুবাইয়াতকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন, সেই তারিখটি উল্লেখ করতে হবে।
১০। নোটিশ গ্রহণের বিবরণঃ রুবাইয়াত নোটিশটি গ্রহণ করেছে কিনা বা তা ফেরত এসেছে কিনা, এই বিবরণ উল্লেখ করতে হবে।
১১। নোটিশের পরও টাকা আদায় না হওয়াঃ নোটিশের পরও রুবাইয়াত যদি টাকা পরিশোধ না করে, তাহলে সেই বিবৃতিও উল্লেখ করতে হবে।
১২। আসামীর জবাবঃ যদি রুবাইয়াত নোটিশের জবাব দিয়ে থাকে, তবে সেই জবাবের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে হবে।
১৩। ১৩৮ ধারায় অপরাধের বিবৃতিঃ আসামীর বিরুদ্ধে ১৩৮ ধারায় অপরাধ হয়েছে, এ মর্মে স্পষ্ট বিবৃতি প্রদান করতে হবে।
১৪। সাক্ষীদের নাম, ঠিকানা ও বাসস্থানঃ মামলা প্রমাণের জন্য যেসব সাক্ষী প্রয়োজন, তাদের নাম, ঠিকানা ও বাসস্থানের বিবরণ উল্লেখ করতে হবে। স্বাক্ষী সাধারনত যে ব্যাংকে ডিজওনার করা হয়েছে সেই ব্যাংকের ম্যানেজার হয়ে থাকেন।
১৫। প্রার্থীত প্রতিকারঃ তাজওয়ারের পক্ষে কোন ধরনের প্রতিকার চাওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, “বাদী চেকে উল্লেখিত ৫ লক্ষ টাকা, সুদ ও অন্যান্য খরচ আদায়ের জন্য দাবী করছেন।”
তাজওয়ারের উচিত তার আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করে মামলা দায়ের করা, যাতে তিনি তার পাওনা অর্থ আইনি প্রক্রিয়ায় আদায় করতে পারেন। উক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তাজওয়ার চেক ডিসঅনারের মামলা করে সঠিকভাবে প্রতিকার পেতে পারেন। আপনি তাজওয়ারের মত ভুক্তভোগী হলে অবশ্যই একই প্রক্রিয়ায় চেকের মামলা করে পাওনা টাকা আদায় করে নিতে পারেন।
চেকের মামলার ফরম্যাট



