নাটোরের এক গ্রামের বাসিন্দা করিম মিয়ার জমি নিয়ে আজকের ঘটনার এই সূত্রপাত। ২০১০ সালে করিম মিয়া তার ছোট ছেলের বিদেশ পাঠানোর উদ্দেশ্যে নগদ টাকার প্রয়োজন হলে তার একটি ১০ শতক জমি বিক্রি করেন তার প্রতিবেশী ছলিম সাহেবের কাছে। ছলিম সেই জমি নিজের নামে খারিজ করেন এবং নিয়মিত খাজনা দিয়ে আসছেন। বছর খানেক পরেই, অর্থাৎ ২০১১ সালে, ছলিম তার জমি বিক্রি করেন মৎস ব্যবসায়ী আব্দুল রশিদের কাছে। রশিদ সেই জমি নিজের নামে খারিজ করেন এবং খাজনা পরিশোধ করে আসছেন আজ অবধি।
এভাবে প্রায় দশ বছরের বেশী সময় কেটে যায়, রশিদ নিশ্চিন্তে নিজের জমি চাষাবাদ করছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই কিছুদিন আগে করিম মিয়ার ছেলে আবু সাইদ সেই জমি নিজের নামে নামজারি করে এবং ঘটনা এতদূর গড়ায় যে, আবু সাইদ ওই জমি বিক্রির জন্য এলাকার মধ্যে কয়েকজন ব্যাক্তিকে প্রস্তাব দেয়।
বিষয়টি এক কান দুই কান করে রশিদের কাছে পৌঁছে যায়, কিন্তু সে ভেবে কূল পায় না যে, একই জমিতে আবার অন্যজনের নামজারি কিভাবে সম্ভব! তাও আবার কোনো সাধারণ ব্যক্তি নয়, করিম মিয়ার বড় ছেলে আবু সাইদ! রশিদ খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন, কারণ এতদিন ধরে তিনি এই জমি তার নিজের বলে জানতেন এবং খাজনাও নিয়মিত দিয়েছেন।
একদিন রশিদ ঠিক করলেন তিনি আইনজীবীর সাথে আলোচনা করবেন। তিনি করিম মিয়ার বড় ছেলের এই নামে নামজারি কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা পেতে চান। করিম দ্রুতই তাদের গ্রামের এডভোকেট সাহেবের চেম্বারে গেলেন।
উকিলবাবু রশিদের পুরো ঘটনা শোনার পর বললেন, “আপনার জমি আপনি নিয়ম মাফিকই কিনেছেন এবং নামজারি করেছেন, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবে প্রথমত, আপনি যে দাগে জমির কিনেছেন খতিয়ান অনুযায়ী সেই দাগে জমির পরিমাণ সম্বন্ধে আগে জানুন। যদি আপনার কেনা জমির বাইরেও একই দাগে আরও কোনো জমি থেকে থাকে, তবে সেটি আবু সাইদ ওয়ারিশসূত্রে পেতে পারেন এবং বিক্রির চেষ্টাও করতে পারেন; এখানে আইনত কোন বাঁধা বা সমস্যা নেই। কিন্তু যদি একই দাগের আপনার জমিটুকুই সে তার নামে খারিজ করিয়ে থাকে, তাহলে এখানে আইনত ঝামেলা আছে।”
এডভোকেট সাহেব রশিদকে একটি পরামর্শ দিলেন- আপনি প্রথমে স্থানীয়ভাবে আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা করুন। ঘটনাটা কি সেটা আপনারা আগে জেনে তারপর এলাকার গন্যমান্য কয়েকজনকে নিয়ে বসুন। প্রয়োজনে চেয়ারম্যান, মেম্বারকে সাথে নিয়ে বসুন। কিন্তু যদি এতে কাজ না হয়, তাহলে আবু সাইদের নামজারি বাতিলের জন্য এসিল্যান্ড বরাবর একটি আবেদন করুন। যদি এটা দিয়েও সমাধান না হয়, তাহলে আপনাকে সিভিল আদালতে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা করতে হবে। এই ধরনের সমস্যা হলে আদালতের মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতে হয়।”
রশিদ উকিলবাবুর পরামর্শ মেনে স্থানীয়ভাবে কথা বসে কথা বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু আবু সাইদ তার দাবীতে অনড় থাকল। পরবর্তীতে করিম সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এসিল্যান্ডের অফিসে গিয়ে আবেদন করবেন এবং প্রয়োজনে আদালতের শরণাপন্নও হবেন। উকিলবাবুর কথায় করিম কিছুটা সস্তি পেলেন যে, তার জমির অধিকার ফিরে পাবার রাস্তা এখনো খোলা আছে।
উপরে বর্নিত ঘটনাটি সত্য, কিন্তু নামগুলো কাল্পনিক। আমি এই গল্পের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, একই জমি যদি একাধিক ব্যক্তির নামে নামজারি বা খারিজ করা থাকে তবে সেটা কি উপায়ে সংশোধন করতে হয় এবং পাশাপাশি কিভাবে এই ধরনের বিরোধের সমাধান করতে হয়। এসি ল্যান্ড অফিসে কিভাবে আবেদন করবেন, তার একটা সম্ভাব্য ফরম্যাট দিয়ে দিব। যদিও আপনি এসি ল্যান্ড অফিসেই ওনাদের নির্ধারিত ফরম্যাটে আবেদন করতে পারেন, তবে একটা প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য ফরম্যাটটি নিচে দেয়া হলঃ
নামজারি বাতিলের জন্য এসিল্যান্ড বরাবর আবেদন ফরম্যাট নিম্নরূপ-
তারিখ: [আবেদনের তারিখ]
বরাবর,
সহকারী কমিশনার (ভূমি)
[আপনার উপজেলার নাম]
[আপনার জেলার নাম]
বিষয়: একই জমিতে দুই ব্যাক্তির নামে নামজারি থাকার কারণে নামজারি বাতিলের প্রার্থনা।
জনাব,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমি [নাম], পিতা/স্বামী: [পিতার/স্বামীর নাম], গ্রাম: [গ্রামের নাম], পোস্ট অফিস: [পোস্ট অফিসের নাম], থানা: [থানার নাম], জেলা: [জেলার নাম] এর স্থায়ী বাসিন্দা। আমি [বিক্রেতার নাম] এর কাছ থেকে [জমির পরিমাণ] শতাংশ/কাঠা জমি কিনেছি [তারিখ] সালে এবং আমার নামে নিয়মমাফিক নামজারি করেছি। এই জমির খাজনাও আমি নিয়মিত দিয়ে আসছি, যার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সংযুক্ত করেছি।
কিন্তু আমি অতি সম্প্রতি জানতে পারলাম যে, একই সম্পত্তি [যার নামে নামজারি আছে] নামে আবার নামজারি হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং প্রচলিত আইনের পরিপন্থী, কারণ একই দাগে দুইজনের নামে নামজারি থাকা অসম্ভব। জমিটি [যার নামে নামজারি আছে] এর পূর্বেই আমি আমার নামে রেজিস্ট্রিমূলে ক্রয় করেছি, তারপর নামজারি করেছি এবং প্রতি বছর খাজনা দিয়ে আসছি।
অতএব, মহোদয়ের নিকট বিনীত প্রার্থনা এই যে, আপনি জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি আমলে নিয়ে পর্যালোচনা করে আমার নামে থাকা নামজারির বৈধতা নিশ্চিত করবেন এবং অন্যায়ভাবে করা নামজারি বাতিল করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
বিনীত নিবেদক
[নাম],
পিতা/স্বামী: [পিতার/স্বামীর নাম],
সাং: [গ্রামের নাম], পোস্ট অফিস: [পোস্ট অফিসের নাম],
থানা: [থানার নাম], জেলা: [জেলার নাম]
মোবাইল নম্বর: [আপনার ফোন নম্বর]
ই-মেইল: [আপনার ই-মেইল যদি থাকে]
সংযুক্তি:
১। জমির দলিলের ফটোকপি
২। খাজনার রশিদ
৩। নামজারি সনদের ফটোকপি
৪। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি
যদি আরও কিছু তথ্য থাকে, আপনি জমির বিস্তারিত তথ্য এবং প্রমাণাদি এখানে সংযুক্ত করতে পারেন। আশা করি, এই ফরম্যাটটি আপনাকে এসিল্যান্ডের কাছে জমির নামজারি বাতিলের জন্য আবেদন করতে যথেষ্ট সাহায্য করবে।



